একজন ব্যাংকারের গল্প

ব্যাংকের উপর অযাচিত ঋণ দেওয়ার কি ধরনের চাপ আসে তা অনেকেই জানেন না। কিন্তু তারা অবলীলায় ব্যাংকারদের জাতপাত তুলে গোষ্ঠী উদ্ধার করতে দরি করেন না। এরকম পরিস্থিতিতে পড়লে তারা নিজেরা কি করতেন তা একবার ও ভেবে দেখেন না।আজকে এরকম দুয়েকটা ঘটনার বর্ণনা করবো।


২০১৮ সালে হজ্ব থেকে ফিরে আসার পর আমাদের একজন ম্যানেজার জানালেন তাকে দশ কোটি টাকার একটা ঋণের জন্য প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।আমি বিস্তারিত শুনে বললাম,ধরে এ ঋণ আপনাকে দিতে হবে না। বললাম তো, কিন্তু এখন করণীয় কি?
ঋণের জন্য চাপ সৃষ্টিকারী একজন দালাল এটা বুঝলাম।সে একজন চাকরিজীবী, বিভিন্ন ধরনের দালালি করে এসব টাকা হাতিয়ে নেওয়া তার অভ্যাস।সে প্রথমে আমাদের শাখার ম্যানেজার কে কনভিন্স করার জন্য ব্যাংকের বড় বড় মানুষের নাম করে তাদের ভাই বলে উল্লেখ করেন, এবং তাদের সাথে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের বয়ান দেন, তার সাথে থাকলে আগামীতে তার পদোন্নতি সহ অন্যান্য সুবিধা নিয়ে ভাবতে হবে না বলে জানায় এরপর যখন ঋণের ব্যাপারে ম্যানেজারের অনাগ্ৰহ দেখে তাকে হুমকি দেওয়া শুরু করল।ঋণটা না দিলে তার কি কি অসুবিধা হতে পারে এগুলো বারবার বয়ান করতে লাগলেন।


ঋণটা দিতে হবে গবাদিপশু পালনের জন্য একব্যক্তিকে,যিনি একজন সাবেক ইউপি সদস্য, তার ছোট একটা খামার আছে যাতে পনরটি গরু আছে , সেখানে কোন ভাবেই দশকোটি টাকা ঋণ দেওয়া যায় না।মূলত ঋণটি তার নামে দেওয়া হলেও টাকাটা নিয়ে যাবেন তদবিরকারী, মাঝখানে ব্যাংকের টাকা চলে যাবে খেলাপির খাতায়।আমি বিষয়টি সেসময়ের এসএমইর প্রধান কে জানালাম যাতে তারা একটা ভিজিট করে আমাদের কিছুটা স্বস্তি দেন। তিনি আমাকে একটু ধীরে চলতে পরামর্শ দিলেন, ক'দিন পর আমাকেই ভিজিট করতে বললেন।

ক'দিন পর আমি নিজেই ভিজিট করার জন্য ঘটনা স্হলে গেলাম।যেয়ে দেখলাম যার নামে দশ কোটি টাকা ঋণ চাওয়া হচ্ছে তাকে বড়জোর দশ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া যায়।আমি তার খামার দেখে তার জামানতের জন্য  প্রস্তাবিত জমি দেখতে গেলাম। তিনি আঙ্গুল তুলে দেখালেন ঐ ঐ জমি তার, সেগুলো সব আবাদি জমি, সেখানে যেতে হলে হেলিকপ্টার ছাড়া উপায় নেই।দশ কোটি টাকা দিয়ে কি করবেন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, প্রথমে একটা ময়দার কল করবেন,কারণ ময়দার কলের উৎপাদিত ভূসি তার খামারে গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হবে। তাকে বললাম দশ কোটি টাকার দৈনিক,মাসে, বছরে কতো সুদ আসবে তিনি জানেন কিনা, এবং টাকা শোধ করতে না পারলে তার সব সম্পদ বিক্রি হয়ে যাবে,তা তিনি জানেন কিনা? কথাবার্তায় জানলাম সম্ভাব্য ঋণগ্ৰহীতা ঋণ সম্পর্কে তেমন কিছুই জানেন না,সব জানেন ঐ বাটপার। খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল এধরনের দালালি করাই তার পেশা। এভাবে বহু লোককে সর্বস্বান্ত করেছে। শেষাবধি আমরা তাকে দশ লাখ টাকা ঋণ দিয়েছি যথাযথ নিয়ম মেনে।

আরেকটি ঘটনা একটু আগের। নোয়াপাড়ায় দেশবন্ধু গ্ৰুপের একটা মবিল বিক্রয় কেন্দ্র ছিল।তার ম্যানেজার যে করেই ব্যা়ংকের পরিচালনা পর্ষদের সর্বোচ্চ ব্যক্তির কাছে পৌঁছে গিয়েছিল, এবং সেখান থেকে তাকে এককোটি টাকা সিসি(প্লেজ) ঋণ দেওয়ার তদবির করাতে সক্ষম হয়। আমরা দেখলাম এ ঋণটি দিলে কখনো ব্যাংকের টাকা আদায় হবে না। আবার তদবির অমান্য করার ক্ষমতা ও আমাদের নেই।সে সময় আমাদের একজন উর্ধ্বতন নির্বাহী ছিলেন খুব দাপুটে এবং হৃদয়বান মানুষ।বাধ্য হয়ে তাকে সব জানালাম, তিনি আমাদের আস্বস্ত করলেন। এরমধ্যে ঘটলো আরেক ঘটনা। দেশবন্ধু গ্ৰুপের দৈনন্দিন খরচের টাকা হেড অফিস থেকে পাঠাতো রিকুইজিশন অনুযায়ী। একবার কোন কারণে টাকা পাঠাতে ভুলে গেলে হেড অফিস থেকে বললো, পরদিন টাকা পাঠাবেন, জবাবে ম্যানেজার বললো অসুবিধা নেই, তিনি চালিয়ে নেবেন।এই কথা শুনে হেড অফিস সন্দেহ করে রাতেই তাদের অডিট পাঠালো নোয়াপাড়ায়। পরদিন সকালে এসে তারা কোম্পানির কোটি কোটি টাকা ঘাপলার ঘটনা উদঘাটন করলো যার সাথে ম্যানেজার প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত। বেচারা চাকরিচ্যুত হলো,আমরাও কোটি টাকার অযাচিত ঋণ দেওয়া থেকে রেহাই পেলাম।

0 Comments