ব্যাংকে একাউন্ট ওপেনিং এর অতীত গল্প

 গতকালকের পর্বটি যে মানুষের ভালো লাগবে সেটা আমি আগে বুঝিনি। অনেকেই ধন্যবাদ দিয়েছেন একান্তই তাদের মনের কথা লিখেছি বলে। আসলে আমি লিখেছি তো বাস্তবচিত্র, সেটাই তাদের মনের সাথে মিলে গেছে। কেউ কেউ মনে করিয়ে দিলেন যে শুধু এসেট ডিপার্টমেন্টের কথা লিখলেন,লায়াবিলিটি ডিপার্টমেন্ট নামে আরও একটা বিভাগ আছে তাদের কাজের ধারা আরো খারাপ,সে ব্যাপারে যেন একটু আলোকপাত করি। আসলে তাদের কথাটা ঠিকই, সেজন্য আজকের পর্ব তাদের জন্য।যারা চাকরিতে আছেন তারা বলছেন পুরো বিষয়টির সাথে একমত হলেও চাকরির কারণে তারা মুখ খুলতে পারছেন না।



আগে ব্যাংক একাউন্ট খোলার ফর্ম ছিল মাত্র একপাতার। তখন ছবি ও লাগতো না, ফর্মে নাম ঠিকানা লিখে আবেদনে একটা এবং নমুনাতে তিনটা স্বাক্ষর করলেই পাঁচ মিনিটের মধ্যে একাউন্ট ওপেনিং শেষ, সাথে সাথে হাতে চেকবই,ব্যাংকের কাজ শেষ। সেই একাউন্ট ওপেনিং ফর্ম এখন হয়েছে ৮/৯ পাতার, সাথে ছবি, বিভিন্ন ধরনের কাগজপত্র, হিসাবধারী এবং ব্যাংক অফিসিয়াল মিলিয়ে গোটা তিরিশেক স্বাক্ষর।এর পর এই ফর্ম কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে যাবে হেড অফিসে, সেখানে বসে আছেন একঝাঁক করিৎকর্মা যাদের কাজ এইসব পূরণ করা ফর্মের বিভিন্ন ধরনের দরকারি অদরকারি ভুল বের করে হিসেব আপডেট করতে যতো বেশি সময় লাগানো যায় সেটা করা।এর একটা আপাতদৃষ্টিতে কারণ আমি খুঁজে পেয়েছিলাম সেটা হলো এখানে পদায়ন করা হয়েছে একদম জুনিয়র লেভেলের অফিসার যারা ব্যাংকিং সম্পর্কে কিছুই জানেনা, হাতে একটা চেকলিষ্ট নিয়ে বসে আছে তার এক অক্ষর বাইরে যেতে তারা নারাজ, তাতে শাখার কি ক্ষতি হলো তাদের কিছু আসে যায় না। কিছু সিনিয়র মানুষ ও এখানে আছেন কিন্তু তাদের বেশিরভাগই বিভিন্ন কারণে হতাশায় ভুগছেন ফলে তাদের দিয়ে কোন কাজ দ্রুততার সাথে করানো আদৌ সম্ভব নয়।

একাউন্ট ওপেনিং ফর্ম এতো বড় এবং জটিল করার কোন যৌক্তিক কারন নেই। এতো স্বাক্ষর নেওয়ার দরকারই বা কি? সবকিছুর শেষে একটা স্বাক্ষর করলেই তো ঝামেলা শেষ।কাজ যতো কমানো যাবে ভুলভাল হবার সম্ভাবনা ততই কমে যাবে। যার এনআইডি আছে তাকেতো বাংলাদেশ সরকার আইডেন্টিফাই করে দিয়েছে, তার জন্য আবার পৃথক আইডেন্টিফিকেশনের দরকার কি? শুধু সময় ক্ষেপণ আর কি?

এবার বিওডির কর্তাদের কাজের কিছু নমুনা বলি। একটা দোকানে চা, কফি,বিস্কুট,কেক বিক্রি হয়,এইদোকানের একাউন্ট খোলার জন্য তারা চেয়ে বসলেন বিএসটিআইয়ের সনদ। পাগল না পেট খারাপ! দোকানের পুঁজি সাকুল্যে বিশহাজার টাকা, বিএসটিআইয়ের সনদ আনতে লাগবে ৪০/৫০ হাজার টাকা।স্হানীয় পর্যায়ে একটা এলপিজির দোকানের একাউন্ট খোলার জন্য ওনারা চাইলেন এক্সপ্লোসিভ লাইসেন্স। দোকানের মূলধন হাজার পঞ্চাশেক টাকা,আর ঐ লাইসেন্সের জন্য লাগবে কমপক্ষে একলাখ টাকা।পাড়ায় একটা এলপিজির দোকানের জন্য চেয়ে বসলেন জেলাপ্রশাসকের অনুমতিপত্র। আমি নিজে খোঁজ নিয়ে দেখেছি জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে এধরনের অনুমতি দেওয়ার কোন বিধান নেই। একজন একটা একাউন্ট করতে আসলো,"অমুক ড্রেজার্স নামে", তাকে বলে দিল বিআইডব্লিউটিএর অনুমোদন লাগবে। এই চাওয়া গুলো কিন্তু সব জুনিয়র লেভেল থেকে। তারা জানেও না এগুলো আদৌ লাগবে কিনা, পাওয়া যায় কিনা? এইসব অপ্রয়োজনীয় কোয়ারিতে সময় ক্ষেপণের মাশুল গুনতে হয় শাখাকে।সময় মতো একাউন্ট আপডেট না হওয়ায় গ্ৰাহক ক্ষতিগ্রস্ত হয়,জবাব দিতে হয় শাখার অফিসিয়ালদের। এরকম ঘটনা ঘটছে আকছার। কিন্তু সমাধান হয়না। শাখা বাধ্য হয়ে বিভাগ প্রধান কে বললে কখনো কখনো সমাধান হয়। কিন্তু তার ওতো লিমিটেশনস আছে।এইসব করিৎকর্মাদের যদি আগে শাখায় কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতো তাহলে এতো জটিলতার সৃষ্টি হতো না। আবার তাদের কাজের জবাবদিহিতা থাকলেও ঝামেলা কম হতো। তারা যদি জানতো তুচ্ছ কারণে একটা একাউন্ট আপডেট হতে অহেতুক সময় নষ্ট হলে তার জন্য শাখাকে কি ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় তাহলে সমস্যা এড়ানো যেতো। এজন্য ওদের কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে আগে।

আপনি যতই সেবা দিতে চাননা কেন একাউন্ট ওপেনিং ই গ্ৰাহক তৈরির প্রথম ধাপ। একজন গ্ৰাহক একাউন্ট ওপেন করতে এসে যদি হয়রানির শিকার হয় তাহলে তাকে আর আপনি খুশি করতে পারবেন না কখনো।ঋণ দিতে চান আর যাই করতে চান একাউন্ট ওপেন সবার আগে।এই ডিভিশনে যারা কাজ করে তাদের সবাইকে আগে শাখার কাজের অভিজ্ঞতা দিয়ে তারপর এসব জায়গায় পদায়ন করলে সমস্যার সমাধান সম্ভব।

0 Comments